সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঝরাপাতার শোক ।। শফিক নহোর।। ছোটগল্প

 



সত্যিই আমরা পরম সৌভাগ্যবান না হলে লাশের মিছিলে সেøাগান দেবার মতো মানুষ পাওয়া এখন সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারিদিকে ভয়ানক অস্থির পরিবেশ।
হুমায়ূন সাহেব এই ফ্ল্যাটের মালিক করোনা ভাইরাস নিয়ে আলোচনার করার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
হুমায়ূন সাহেব ধনী মানুষ বয়স্ক এছাড়াও তাঁর আর্থিক দিক আমাদের চেয়ে সচ্ছল প্রাচূর্য ম-িত জীবন যাপন করে অভ্যাস।
তিনি সহ আমরা দশ বারোজন উপস্থিত হয়েছি ।
আমাদের মধ্যে কেউ আসতে অপারগতা প্রকাশ করেনি। করবেই বা কেন ? আমাদের এখন করোনা ভাইরাস নিয়ে বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া করোনা ভাইরাস আমাদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের  হুমকি ।

গুরুগম্ভীর কণ্ঠে হুমায়ূন তার বক্তব্য শুরু করেছেন । ‘আপনারা জানেন নিশ্চয়ই....।’
বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, পত্রিকায় প্রকাশিত করোনা ভাইরাসের খবর দেখেছেন; এ সংখ্যাবৃদ্ধি দিনদিন বাড়তে পারে বলে ব্যাখ্যা করেন ।
‘যে সব বিষয় নিয়ে কথা হল ।
‘আপনারা কি ফেসবুকে অথবা টেলিভিশনে বা পত্র-পত্রিকায় প্রচার দেখেছেন ?
রোগের ধরন খুব সাধারণ হলেও রোগ কিন্তু সাধারণ না। আমরা রীতিমতো ভয় পাচ্ছি কোন কোন হাসপাতালের ডাক্তার চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছেন। নার্স পালিয়ে বাড়ি চলে গেছে তা যদিও কোন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি।
‘এটা কি একটু বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না ?
‘না না, সত্য চিরকালই মানুষের কাছে চরম তিক্ত, একটুও বাড়িয়ে বলছি না।

হুমায়ূন সাহেব ঠা-া মাথায় মোলায়েম স্বরে গর্বের সঙ্গে বললেন। সরকার এটা মোকাবেলায় দেশের সেনাবাহিনী নামিয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কাজ করছে, তবে মনের ভেতরে একটা ভয় তাদের আছে। সেটা মানুষের কাছে প্রকাশ করা সহজ হবে না।
আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাড়াতে হবে মানুষের ভেতর সচেতনতা তাহলে মহামারি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে হয়তো ।
তবে দেশে যখন মহামারি আসে তখন কে হিন্দু কে মুসলিম আর কে খ্রিষ্টান তার মুখ দেখে রোগ ধরে না। তাই সবাইকে ব্যক্তিগত ভাবে সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন জায়গা লক-ডাউন হয়েছে; এটা জানানো সাধারণ মানুষের মনের ভিতরে যেমন ভয় ঢুকে গেছে, আবার নিজে থেকে সচেতন হবে এটাও ঠিক ।
‘তাহলে সতর্কতার সঙ্গে আমাদের সরকারের নির্দেশগুলো মেনে চলতে হবে। এই নির্দেশনাগুলো সরকারের পক্ষে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, টিভিতে প্রচার করতে হবে বেশি।
বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে, হাট-বাজারে ব্যানার তৈরি করে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। তা না হলে অল্প একটু অবহেলায় আমাদের দেশে বয়ে যেতে পারে লাশের জলপ্লাবন ।
‘এসব খরচ কি আমাদের দিতে হবে ?
আমাদের মধ্যে একজন সাধারণ মানুষ জিজ্ঞাসা করলো ।
হুমায়ূন ভাই পবিত্র কোরআন শরীফ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,
সূরা নাসে পারলৌকিক বিপদ আপদ ও মুসীবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিজেদের পাপ কর্মের জন্য লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে সৃষ্টিকর্তার নিকট পৃথিবীর কোনো দেশ এখনো সঠিক চিকিৎসা আবিষ্কার করতে পারেনি ।
আসল কথা হচ্ছে যখন কোন ডাক্তার চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যর্থ তখন আমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট ফিরে যেতে হয়। তার আগে আমরা অবহেলায় ভুলে যাই। মানুষের উপর কখনো পুরোপুরি নির্ভর করবেন না। এতে আপনাদের মঙ্গল হবে ।
‘আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি থাকবো।
সাধারণ বিষয়ে নিজেদের প্রতি বিশ্বাস রাখবেন। আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের রক্ষা করবেন।
তবে মনে রাখবেন, দাওয়া ও দোআ খুব বেশি প্রয়োজন কেউ কেউ পানি পড়া খাচ্ছেন। সেই হজুর ফার্মেসি থেকে পেট খারাপের জন্য ওরস্যালাইন, ফ্লাজিল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অন্ধভক্ত হয়ে বসে থাকার দিন এখন নেই।
যদি সম্ভব হয় রুমের ভেতর থাকবেন। বিশেষ প্রয়োজন না হলে বাহিরে যাবার প্রয়োজন নেই। এমন নিয়ম কেউ কেউ সহজে মেনে নিবে না। নিজেদেরকে বড় ডাক্তার হিসাবে জাহির করবে। নিজেরা বেশি বুঝতে গিয়ে অবহেলায় মহামারি ডেকে আনবেন না ।
বিপুল উৎসাহ এবং আন্তরিক দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আমরা সেদিন হুমায়ূন ভাইয়ের ফ্ল্যাট থেকে বাড়ি চলে এলাম ।
শীঘ্রই করোনা ভাইরাস নিয়ে আমাদের মাথার ভেতরে ঢুকে গেল বাদবাকি চিন্তা-ভাবনা।
আমাদের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই বলতে শুরু করলো, করোনা ভাইরাসে এখন হাঁস মুরগী মরছে। মানুষ মরার কথা কেউ প্রকাশ করছে না। এমন খবর শুনে গ্রামের মানুষের চোখে পাথর বৃষ্টি শুরু হলো অবহেলা করে এড়িয়ে গেলেই হয়তো মহামারি তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগবে না ।
বিদেশ থেকে ফিরে গ্রামেই পাঁচতলা বিল্ডিং তৈরি করে গ্রামকে শহরে পরিণত করে প্রথম দিকে হুমায়ূন ভাই ।
নিজেদের সতর্ক হতে হবে। হুমায়ূন ভাইয়ের কথায় আমরা তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছি; তখন বিষণ্ন দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে চোখ পড়তেই হাজারটা না বলা কথা বলা হয়ে যায় ।

আমারা কোথাও বন্দি থাকলে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ হতো কিন্তু কারাগারে কেউ শান্তিতে নাই ।
‘আমরা এখন একটা যুদ্ধে আছি। বলতে পারেন দেশে এখন জরুরি অবস্থা চলছে। আমরা শুধু মৃত্যুর ভয়ে ভীত নই,  একটা বিভীষিকাময় মহামারীর সম্মুখীন দেশের মানুষ। আল্লাহ্ আমাদের সহায় না হলে বুঝে নিতে হবে জীবনের শেষবেলায় শুধুই আমরা ভুল বকছি অপরের দোষ দিয়ে। নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে হবে। এটাই চির সত্য।
বিভিন্ন অফিসে তাপমাত্রার মেকি মেশিন নিয়ে কেউ কেউ মানুষের মনের ভেতর ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তি স্বার্থে দরিদ্র মানুষের জীবনের মান আরো নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে, বাড়ছে মানুষের প্রতি অবহেলা শুধু অবহেলা নয় চরম অবহেলা ।

সুসংবাদ আসে আলো বাতাসের মতো কেউ কেউ সুস্থ হয়ে আপন গৃহে ফিরে যাচ্ছে। অসাধু মানুষের মনের ভেতরে নীরবে বয়ে চলছে ঈদ আনন্দ। কসাই চামারের মতো অসহায় মানুষের কাছ থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য চোখের   সামনে ভেসে উঠলে বাবার মুখে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার কথা। মনের খোয়াবনামায় বেদনার সুর তলে বেহুলার করুণ সে সুর ।
খুব অল্পতেই একশ্রেণীর মানুষের বিশ্বাস ভেঙ্গে গেছে । সঠিক ভাবে কারো প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারছে না। নিজেদের বোকামির কারণে নিজেরাই তৈরি করছে মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

মহামারি পৃথিবী সৃষ্টি লগ্ন থেকেই বিভিন্ন জাতি বংশ পরস্পর ছিল। কিছু বছর পর এর রূপ পরিবর্তন করে ভয়ানক ভাবে আমাদের সামনে আবার কেউ আসবে তখন কি ভাবে বেঁচে থাকবে পৃথিবীর মানুষ। নিজে একা কখনও ভাল থাকা যায় না। পরিবার, সমাজ, দেশ পাশের রাষ্ট্র সবাইকে একে অপরের প্রতি আন্তরিক না হলে মহামারি আসবেই। মৃত্যু আমাদের হাত দিয়ে ইশারা দিয়ে যাবে অপ্রত্যাশিত ভাবে ক্ষণেক্ষণে, আমরা প্রিয় মানুষের লাশ নিয়ে পড়বো নতুন এক দুশ্চিন্তায় ঝঁরাপতার মতো শোক আমাদের কাছে ম্রিয়মাণ ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একান্ত ব্যক্তিগত চিঠি || শফিক নহোর

 প্রিয় মেঘবালিকা, বৃষ্টিভেজা এই অলস দুপুরে জানালার পাশে বসে আছি। চারপাশে এক অদ্ভুত সুনসান, কেবল রিমঝিম শব্দে বৃষ্টি যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছে। আর আমি? আমি এই বৃষ্টিস্নাত নির্জনতায় হারিয়ে যাচ্ছি তোমার স্মৃতির ভেতর—ধীরে ধীরে, গভীরভাবে এ এক গভীর প্রেমের নিঃসঙ্গতায় তুমি জুড়ে থাকো আমায়। আজকের এই চিঠি কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়, এটি আমার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। এমন এক হৃদয়, যা আজও শুধুমাত্র তোমার ছায়া খুঁজে বেড়ায় প্রতিটি বাতাসে, প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। জানো, এই বৃষ্টির দিনগুলো কেমন যেন তোমার মতো হয়ে যায়—নরম, গভীর, আর অনির্বচনীয়ভাবে আবেগে পূর্ণ। তোমাকে মনে আছে সেই এক বিকেল? তোমার চোখে সেই অসমাপ্ত গল্পের ভাষা ছিল, যা আমি বুঝতে চেয়েও বোঝার সাহস পাইনি।  তোমার পরনে ছিল নীলরঙা পোষাক, ঠোঁটে ছিল মৃদু হাসি—যা দেখলেই মনে হতো, পুরো দুনিয়া যেন থেমে গেছে কেবল তোমাকে দেখার অপেক্ষায়। তুমি তখন খুব সাধারণভাবে বলছিলে, "আজ আকাশ ভীষণ মনখারাপ করেছে..." আমি চলে যাবো। আমি চুপ রইলাম। ভেতরে ভেতরে বলতে ইচ্ছে করছিল, "না, আকাশ না, মনখারাপ করেছি আমি—কারণ আমি তোমার মনের জানালায় ঢুকতে পারছি...

ছোটগল্প : মৃত বৃক্ষ।। শফিক নহোর

অনেকদিন ধরে বোয়ালমাছ খাবার বায়না ধরেছে মিনু, ও চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা । আজ চলতি মাসের একুশ তারিখ । হাতের অবস্থা বড়ই নাজুক । মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, বেতন হাতে পেলে তুমি যা-যা খেতে চাও? সব এনে দিবো ,চিন্তা করো না। ‘এখন খাবার দাও ?' আমার অফিসে যাবার সময় হলো । ভিলেন মার্কা অভদ্র একজন অফিসার আছে ,সবসময় মানুষের পিছনে একটা পিন বিধিয়ে দেবার পায়তারা চলে অবিরাম ।‘কাকে কি ভাবে পিন দিবে !'আস্তাগফিরুল্লাহ মানুষ কী তাই এত খারাপ হয় । এ অফিসে চাকরি না হলে হয়তো বুঝতাম না ।সকালে বউ রসুনের পাতা দিয়ে টমেটো ভর্তা করেছে ,আহা কি স্বাদ ।গরম ভাতের সঙ্গে হালকা একটু বলরাম কাকার হাতের তৈরিকরা ঘি, ঢেলে নিলাম ।স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে-গেল ।বউ আমার পিছনে দাঁড়িয়ে বলছে, - এই শুনছো, -হ্যাঁ বল, -আমাদের তো একদিনও চিড়িয়াখানা নিয়ে গেলে না । এ সময় চিড়িয়াখানা যেতে নেই । লোকমুখে শুনেছি , ছেলেমেয়ে দেখতে না-কি বানরের মত হয় । ও আল্লাহ্ তুমি এসব কি বলও ।হুম সত্যি বলছি গো বউ ।তা না হলে তোমাকে নিয়ে যাবো না কেন ? তুমি আমার একমাত্র আদরের লক্ষীসোনা বউ । আমার খাওয়া শেষ, বউয়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছে খাঁটের উপর বসলাম । বউ আমা...

প্রিয় মায়াপাখি।। শফিক নহোর

প্রিয় মায়াপাখি কুয়াশায় ঢাকা শহরের তারকাটার অদৃশ্য দেয়াল। কেউ ঢুকতে পারছে না শহরের তারকাটা ভেদ করে। কুয়াশা কোন দেওয়াল মানেনি। সে প্রকৃতির নিয়মে চলে। প্রকৃতিকে রোধ করা যায় না। ভালোবাসা , বিশ্বাস , অনুভূতি হচ্ছে প্রকৃতির অনুচ্ছেদ তাকে কোন নিয়ম দিয়ে আলাদা করতে পারে না। ভৌগোলিকভাবে তুমি দূরে থাকলে বাতাসের সঙ্গে সূর্যের আলোর সঙ্গে তোমার শরীরের ঘ্রাণ ভেসে আসে আমার নাকের ডগায়। তুমি একদিন যোগাযোগ না করলে , দীর্ঘ একাকীত্বের ভেতর ডুবে থাকি তোমার পুরনো স্মৃতিচারণ মনে করে । এই সুখই আমার পরম প্রাপ্তি। তুমি জানতে চাও ! অথচ আমি জানাতে পারি না। এটা আমার অপারগতা ! জানি বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। নিজের কাছেই বিশ্বাস হয় না। নিজের হাত খরচ নেই , আলাদা আড্ডা নেই, বন্ধুদের সঙ্গে পকেট শূন্যতা একধরনের বিষণ্ণ স্বরে কারো কারো চা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে হয়। প্রতিদিন একজনের চা খাওয়া যায় না। ভেতরে ভেতরে লজ্জাবোধ কাজ করে। কারো সঙ্গে দেখা হওয়া জরুরি অথচ দেখা করতে পারছি না। এই কষ্ট ও অপরাধ ব...