সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ছোটগল্প : মৃত বৃক্ষ।। শফিক নহোর




অনেকদিন ধরে বোয়ালমাছ খাবার বায়না ধরেছে মিনু, ও চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা । আজ চলতি মাসের একুশ তারিখ । হাতের অবস্থা বড়ই নাজুক । মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, বেতন হাতে পেলে তুমি যা-যা খেতে চাও? সব এনে দিবো ,চিন্তা করো না। ‘এখন খাবার দাও ?' আমার অফিসে যাবার সময় হলো । ভিলেন মার্কা অভদ্র একজন অফিসার আছে ,সবসময় মানুষের পিছনে একটা পিন বিধিয়ে দেবার পায়তারা চলে অবিরাম ।‘কাকে কি ভাবে পিন দিবে !'আস্তাগফিরুল্লাহ মানুষ কী তাই এত খারাপ হয় । এ অফিসে চাকরি না হলে হয়তো বুঝতাম না ।সকালে বউ রসুনের পাতা দিয়ে টমেটো ভর্তা করেছে ,আহা কি স্বাদ ।গরম ভাতের সঙ্গে হালকা একটু বলরাম কাকার হাতের তৈরিকরা ঘি, ঢেলে নিলাম ।স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে-গেল ।বউ আমার পিছনে দাঁড়িয়ে বলছে,


- এই শুনছো,

-হ্যাঁ বল,

-আমাদের তো একদিনও চিড়িয়াখানা নিয়ে গেলে না । এ সময় চিড়িয়াখানা যেতে নেই । লোকমুখে শুনেছি , ছেলেমেয়ে দেখতে না-কি বানরের মত হয় । ও আল্লাহ্ তুমি এসব কি বলও ।হুম সত্যি বলছি গো বউ ।তা না হলে তোমাকে নিয়ে যাবো না কেন ? তুমি আমার একমাত্র আদরের লক্ষীসোনা বউ । আমার খাওয়া শেষ, বউয়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছে খাঁটের উপর বসলাম । বউ আমার শরীর ঘেঁসে বসলো । আচ্ছা তুমি এত তাড়াতাড়ি অফিসে যাচ্ছো কেন ? তাড়াতাড়ি মানে, বেলা ন'টা বাজতে চললো । আমরা তো আর সরকারি অফিসে চাকরি করিনা । বেলা বারটার সময় গেলেও সমস্যা নেই । ‘ কোম্পানির চাকরি এক টাকার ভিতর থেকে ষোল টাকা বের করে । অনেক -ই আছে , রসুনের চোচা ভাজি করে খায় ।’

অফিস শেষে করে বাসায় ফিরতে আমার একটু দেরি হলেই, ফোন । ‘ তুমি এখনো আসছো না কেন ?' কলিঙদের সঙ্গে আড্ডা বাদ দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা সেই পুরাতন পথ ধরে । অলিগলি পার হয়েই যখন বাসার খুব কাছে যাই , হাতে করে বউ,বাচ্চার জন্য কিছুই নিয়ে যেতে পারি না । মাস শেষে সংসারের খরচ, নিজের ওষুধ ,মিনুর ওষুধ বাসা-ভাড়া ,বাজার এ সব শেষ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ।এখানে পানি পর্যন্ত কিনে খেতে হয় । এর নাম আজব শহর ঢাকা । আহা রে ! আগে মনে করতাম ঢাকা মানেই সুখের নগরী । এখন মনে হয় , এ নগর থেকে দূরে সরে থাকাই ভাল । ভয়ে পরিচিত কারও কাছে বাসার ঠিকানা দেই না । বাসায় একজনকে নিয়ে এসে কি খেতে দিবো ।এত টানাটানির ভিতর সংসার করতে হচ্ছে । এইট পাশ মানুষ এই ডিজিটাল যুগে কত টাকার বেতনে চাকরি করবে ! কত টাকা হলে যমুনা ফিউচার পার্কে সিনে কমপ্লেক্স বাংলা সিনেমা দেখতে যাওয়া হবে । বউ খুব আহ্লাদ করে একদিন বলেছিল, এই তুমি না আগে বলতে, 'ঢাকা নিয়ে গেলে আমাকে বড় পর্দায় সিনেমা দেখাবে মিথ্যাবাদী '। আমাকে তো সিনেমা দেখাতে নিলে না । সিনেমা দেখতে হয়না । আল্লাহ্ গুনাহ্ দিবে । মিনুকে জীবনে কত গুলো মিথ্যা কথা বলেছি , শুধু মাত্র অভাবে পড়ে , মা বলতো ,বাজান রে ! কখনো মিথ্যা কথা বলিস না । মা , দুটি মিথ্যা কথা বলি বলেই সুখে সংসার করছি ।

ডাক্তার দেখানোর পর, একটা ধাক্কা খেলাম ।পুষ্টিহীনতায় ভুগছে , তার পরে মিনুর প্রস্রাবে ইনফেকশন । পায়ে পানি লেগে গেছে । ডাক্তার ফুল বেড রেস্ট থাকতে বলেছে । পেটের বাচ্চার উপর বিশেষ একটা প্রভাব পড়বে তা, শোনার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল । শাক-সবজি,ফলমূল তেমন খাওয়ানো হয়নি । তার পরে যে বিষয়টা সব চেয়ে বেশি সমস্যা হয়েছে, ' অল্প বয়সে মা হওয়াটা '। বড় আপা বলেছিল , অল্প বয়েসি মেয়েকে বিয়ে না করতে , গ্রামের লোকজন বন্ধু অনেক-ই বলেছিল না করতে ; কিন্তু পরিবেশটা এমন হয়েছিল , সেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি । মিনুরা গরিব মানুষ , অসহায় পরিবার । বাবা নেই, মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। মামার বাড়ি থেকে লেখাপড়া কোন মত বিয়ে দিতে পারলে তাঁরা একটা নিশ্বাস নিতে পারে । এমন একটা পর্যায়ে চলে আসছিল , তখন আমি নিজেই জানার পরেও একটা ভুল করলাম ।

দ্বিতীয় ভুল হয়েছিল , মিনুর পেটে যখন সন্তান আসে । তখন আমি চেয়েছিলাম, ওকে দুনিয়াতে না আনতে , এ কথা মা শুনে , আমাকে প্রচণ্ড বকাবাজি করেছে । এক পর্যায়ে আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছে । ' এমন পাপ কাজ করতে তোর লজ্জা করে না হারামজাদা। বংশের আলো আসছে আর তুই তা নিভিয়ে দিতে চাস পাজি কোথাকার । খবরদার আমার সামনে আসবি না কিন্তু ?” মায়ের কড়া শাসন । আমি লজ্জায় ঘর থেকে বের হয়ে চলে আসলাম সেদিন । কিসব গাছারা ওষুধ খেয়েছিল মিনু ।

 

পরিবারের কথা শুনে পরে বুঝলাম সত্যি অল্পবয়েসি মেয়েকে বিয়ে করা ঠিক হয়নি ।এটা মারাক্তক ভুল , অপরাধও বটে। ভুয়া জন্মনিবন্ধন নিয়ে মিনুর বিয়ে হয় । মিনুর বয়স তখন ষোল বছর । কলেজে পড়ে । এখনো কোন কোন গ্রামে ষোল বছর বয়স মানে অনেক বয়স । মেয়ে মানুষ ঘরে রাখলে খারাপ হয়ে যাবে , পরে আর বিয়ে হবে না । চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে । কত ধরণের কিচ্ছাকাহিনি শুনতে হয়েছে, মিনুর । চোখ গড়িয়ে জল পড়তেই আমার চোখ চলে গেল মিনুর দিকে । আহারে ! বিচারি । এখন ওর মনে হচ্ছে হয়তো মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটা ওর একটা অভিশাপ ।

আমি মিনুর পাশে গিয়ে বসলাম,সুদীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিয়ে আমাকে বলছে , আমার উপর কি তুমি রাগ করে আছো । ধূর পাগলি , বউয়ের উপর রাগ করতে নেই । আমি মৃদু হেঁসে ওর হাতের সঙ্গে আমার অপারগ আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলাম, পুলকিত হলো । এ সময় মেয়েরা একটু ভালবাসা চায় , সহানুভূতি পেতে ভাল লাগে । এ সময় বাঙালি মেয়েরা সাধারণত মায়ের বাড়িতে থাকে । আমিও মনে মনে ভাবছি , ওকে কিছুদিন পর রাজবাড়ি পাঠিয়ে দিবো । আমাকে বলছে, তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে থাকবে । আমাদের যেদিন সন্তান হবে সেদিন তুমি আমার পাশে থাকবে । আমার প্রচণ্ড ভয় করে । আমি ঠোঁটের কিনারে হালকা হাসি মেখে বললাম, আমি থাকলে তোমার ভয় করবে না । গৃহপাতালক শিশু বাচ্চার মতো জবাব দিল না । বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরতেই মনে হলো আমার অপূর্ণতা দূরে চলে গেল ।

 

রাতে শাশুড়ি ফোন দিয়ে বলল..

-বাবা, মিনুর, অবস্থা খুব বেশি ভালো না । তুমি দ্রুত রওনা দাও । আমি ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এখনো ন'দিন বাকি ডাক্তার যে তারিখ দিয়েছিল..,

আমি রাতেই রওনা হলাম ।বাসা থেকে অনেক দূর চলে এসেছি , পকেটে হাত দিয়ে বুঝতে পারলাম মোবাইল ফোন ভুলে রেখে এসেছি । আবার ফিরে গেলাম । মোবাইল নিয়ে আসবার পথে অজ্ঞাত নম্বর থেকে কল । হ্যাঁ বলতেই ওপাশ থেকে ভিজাকণ্ঠে কান্নার আওয়াজ মনভার হয়ে গেল। আমি বোকা মানবে পরিণত হলাম। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না । ভোরে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার চোখ ভিজে ঝাপসা হয়ে ওঠছে, শাশুড়ি আমাকে ভিতরে আসতে বলল । অপারেশন থিয়েটার থেকে মিনুকে বের করে নিয়ে আসছে ।সাদা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে । এত মায়া হচ্ছিল ।মনে হচ্ছে মিনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখি । ডাক্তার জানিয়ে দিল ।

-বাচ্চা ও মাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি । আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম । ভিতর থেকে পোড়া বারুদের গন্ধ বের হতে লাগল নিজেকে পোড়া ধূপ শিখার মত মনে হতে লাগল...!

ঘরে এলইডি বাল্ব লাগানো তবুও অন্ধকার লাগছে আমার কাছে , ছোট একটা রুম দুটি বাতি জ্বলছে তবুও কত অন্ধকার । এ ঘরে বাতি না জ্বালালেও আলোকময় হয়ে থাকত সব সময় । মিনু ছিল আমার জীবনে একটি আলোকিত বাতির মত । আজ সংসারে অভাব নেই । মানিব্যাগের কোণায় টাকা ভর্তি বোয়ালমাছ কিনতে চাইলেই পারি !

‘আমাকে কতদিন ধরে বলেছিল বোয়ালমাছ খাবে । মাটির নিচে রান্নাকরা বোয়ালমাছের তরকারির ঘ্রাণ কি আজ মিনু পাবে !’

ছয়-নয় ভাবতেই, পিছন থেকে আমার শাশুড়ি আমাকে ডাকছে, অশ্রুভেজা চোখে আনন্দের ঢেউ এসে পড়ল...

-মিনু মরেনি !

আমি বিস্ময়কর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম , বুঝে উঠতে পারছি না কি বলব। চারিদিকে মৃদু বাতাস , পরিবেশ কেমন শান্ত হয়ে গেল । তারকারাজি আকাশ থেকে নৃত্যময় অবস্থায় নেমে আসছে, আমাকে প্রেমময় চাঁদ আলিঙ্গন করছে । আমি তার বুকে নতজানু হয়ে ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলাম ! ‘আত্মা বেঁচে থাকে মানুষের মতো একটি রূপ নিয়ে অনন্তকাল ।'

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একান্ত ব্যক্তিগত চিঠি || শফিক নহোর

 প্রিয় মেঘবালিকা, বৃষ্টিভেজা এই অলস দুপুরে জানালার পাশে বসে আছি। চারপাশে এক অদ্ভুত সুনসান, কেবল রিমঝিম শব্দে বৃষ্টি যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছে। আর আমি? আমি এই বৃষ্টিস্নাত নির্জনতায় হারিয়ে যাচ্ছি তোমার স্মৃতির ভেতর—ধীরে ধীরে, গভীরভাবে এ এক গভীর প্রেমের নিঃসঙ্গতায় তুমি জুড়ে থাকো আমায়। আজকের এই চিঠি কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়, এটি আমার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। এমন এক হৃদয়, যা আজও শুধুমাত্র তোমার ছায়া খুঁজে বেড়ায় প্রতিটি বাতাসে, প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। জানো, এই বৃষ্টির দিনগুলো কেমন যেন তোমার মতো হয়ে যায়—নরম, গভীর, আর অনির্বচনীয়ভাবে আবেগে পূর্ণ। তোমাকে মনে আছে সেই এক বিকেল? তোমার চোখে সেই অসমাপ্ত গল্পের ভাষা ছিল, যা আমি বুঝতে চেয়েও বোঝার সাহস পাইনি।  তোমার পরনে ছিল নীলরঙা পোষাক, ঠোঁটে ছিল মৃদু হাসি—যা দেখলেই মনে হতো, পুরো দুনিয়া যেন থেমে গেছে কেবল তোমাকে দেখার অপেক্ষায়। তুমি তখন খুব সাধারণভাবে বলছিলে, "আজ আকাশ ভীষণ মনখারাপ করেছে..." আমি চলে যাবো। আমি চুপ রইলাম। ভেতরে ভেতরে বলতে ইচ্ছে করছিল, "না, আকাশ না, মনখারাপ করেছি আমি—কারণ আমি তোমার মনের জানালায় ঢুকতে পারছি...

The Nomira || Shafiq Nohor

A shadow lingers though the light has gone. I walk alone, though I once belonged. Close was your voice, yet far was your heart. We stood together, still worlds apart. I burned in silence, turned to gold, Yet you cast me off—uncared, cold. I reached for truth, found only pain, Loved you through loss, loved you in vain. Your absence echoes, sharp and deep, Even in dreams, I cannot sleep.