সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গল্প জলের গল্প।।শফিক নহোর

অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম রাত তখন বোধহয় ১১টা পেরিয়ে গেছে। চেয়ারম্যানের বাড়ির কলপাড়ে ফুলমতি ওয়াক থু-ওয়াক করছিল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের শেষ টানটা দিচ্ছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে। শীতের রাতে কল থেকে ছলাৎ ছলাৎ পানি পড়ার শব্দ, পেয়ারা গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির টুপটুপ করে পড়ছিল মাটিতে। আমি সিগারেটের আগুন শেষের অপেক্ষায় আঙুলের গোড়ায় অনুভব হচ্ছে। এই শেষ, ভেতরে ঢুকব ঢুকব করছিলাম- ঠিক তখনই ফুলমতি মাথা তুলল। চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটা চমকে উঠল। শাড়ির আঁচল কলের জলে ভিজে সরে গেছে, ব্লাউজ প্রায় খোলা, বুকের কাছটা ভেজা। এই শীতের রাতে অর্ধনগ্ন শরীর নিয়ে সে কলপাড়ে হাঁটু গেড়ে বসে বমি করছিল- চোখ দুটো লাল, পা দুটো কাঁপছে। আমাকে দেখে লজ্জায় তড়িঘড়ি করে শাড়ির আঁচল টেনে পাশের অন্ধকার ঘরে ঢুকে গেল। দরজাটা বন্ধ হলো- কিন্তু শব্দ হলো না। যেন মেয়েটা জানে, এই বাড়িতে শব্দ করার অধিকার তার নেই। আমি সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষলাম। এমন করেই মানুষ মানুষকে ব্যবহার শেষে পিষে দেয়। পেয়ারা গাছের ডাল ধরে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। গাছের পাতা থেকে একফোঁটা জল এসে কপালে পড়ল, তার পর গাল বেয়ে নামল, তার পর থুঁতনির কাছে এসে থেমে গেল- যেন ভাবছে কোথায় যাবে। শীত এসে গেছে বলে মনে হলো। কামারহাটের মাঠ থেকে কুয়াশা উঠছে, দূরে কোথাও একটা শিয়াল ডাকল- তার পর চুপ। তার পর আবার ডাকল। তার পর আবার চুপ। রাত নামলে মানুষের চেহারায় যেন অন্য এক রূপ ফুটে ওঠে। পুরুষ বাইরে থাকলে সেই রূপের অদ্ভুত জাদু অনেক সময় নারীকে ভেলকি দিয়ে ফেলে। পাশের ঘর থেকে কথা ভেসে এল। ‘মাগি বারবার কলপাড়ে গিয়ে ফন্দিফিকির করছে। শরীরটা একটু নেড়েচেড়ে দিলে তাও একটু ভালো লাগত। অনেকক্ষণ ভালো কোনো কার্ড হাতে পড়ছে না। রইতনের টিক্কা থাকলে খেলাটা আমার হাতেই শেষ হতো।’ মধু চেয়ারম্যানের গলা। চিনতে ভুল হওয়ার উপায় নেই। তার পর হাসির শব্দ। একসঙ্গে কয়েকজন। আমি পা বাড়ালাম। এই গ্রামে মধু চেয়ারম্যানকে সবাই চেনে, সবাই মান্য করে, আর বেশির ভাগ মানুষ ভয় পায়। আমিও পাই- তবে সেটা অন্য ধরনের ভয়। যে ভয়ে গলা শুকায় না, বরং বুকের ভেতরে ধিকিধিকি একটা রাগ জ্বলতে থাকে। নেভে না, আবার দাউদাউ করে জ্বলেও ওঠে না। শুধু পোড়ায়। মধু চেয়ারম্যান কামারহাটের সরকারি পুকুরে জোর করে মাছ চাষ করে। চরের জমি দখল করে। নির্বাচনের আগে বস্তা বস্তা চাল বিতরণ করে- রাতের আঁধারে, চুপিচুপি, যেন দান নয়, ঋণ। পরে সেই ঋণ উশুল করে নেয় অন্যভাবে। কাজের বরাত দিয়ে, ঠিকাদারি দিয়ে, থানায় মামলা করিয়ে আবার থানায় মিটিয়ে দিয়ে। তবু লোকে তাকে ভোট দেয়। আমি এক বছর আগে মেম্বার প্রার্থী হয়েছিলাম। এই গ্রামে জন্মেছি, এই মাটিতে বড় হয়েছি, কারও সঙ্গে বিবাদ নেই, কারও জমি মারিনি, কারও বউ-মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি- তবু হারলাম। বিস্তর ভোটে হারলাম। লোকে বলে আমার জনপ্রিয়তা নেই। আমি ভাবি- জনপ্রিয়তা কীভাবে তৈরি হয়? মানুষকে ভয় দেখিয়ে? নাকি মানুষের ভয়কে কাজে লাগিয়ে? উত্তরটা জানি। কিন্তু মুখে বলতে পারি না। এই গ্রামে কিছু সত্য আছে- যেগুলো সবাই জানে, কেউ বলে না। ভেতরের ঘরটা সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরা। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম চারজন মানুষ তাস খেলছে- মধু চেয়ারম্যান, মাছ বিক্রেতা রতন মিয়া, দিনমজুর হাশেম, আর চাষি বজলু। এরা সবাই আলাদা মানুষ- দিনের বেলায়। কিন্তু এ ঘরে ঢুকলে তাদের আর চেনার উপায় থাকে না। গোয়ালঘরে গরু বেঁধে রাখলে সব গরু একরকম দেখায়। এই আলো-আঁধারিতে মানুষগুলোকেও তেমনই লাগছিল- ধোঁয়ার ভেতরে ভাসছে, তাস ছুড়ছে, হাসছে, চিৎকার করছে। ফুলমতি কিছুক্ষণ আগে চা দিতে এই ঘরে ঢুকেছিল। হাশেম চা নেওয়ার সময় মেয়েটার বুকে হাত রেখেছিল। ফুলমতি সরে যায়নি। থমকে দাঁড়িয়েছিল এক মুহূর্ত- মাথা নিচু, চোখ মেঝেতে। তার পর চুপচাপ বেরিয়ে গিয়েছিল। অবিবাহিত মেয়ে। ফুলমতির বয়স আঠারো হবে। বাড়ি কোথায় জানি না। বাবা আছে কি না জানি না। শুনেছিলাম কোনো এক আকালে এই বাড়িতে এসেছিল কাজ নিয়ে। তার পর থেকে আছে। তার গতরের গড়ন দেখে আজ মনে হলো- পোয়াতি। ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরে একটা ধাক্কা লাগল। কলপাড়ে বমির কারণটা তাহলে... আমি আর ভাবতে পারলাম না। পেটের ভেতরে একটা মোচড় উঠল, গলায় তেতো কিছু একটা এল। নাউজুবিল্লাহ। হে আল্লাহ, তুমি আদম সন্তানকে ক্ষমা করো। দোয়া পড়তে পড়তে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু পা যেন এগোতে চাইছিল না। মনে হচ্ছিল পেছন থেকে কেউ ধরে রেখেছে- কে ধরে রেখেছে, কেন ধরে রেখেছে, সেটা বুঝতে পারলাম না। সেই রাতে আর ঘুম হলো না। বিছানায় শুয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাইরে শিশির পড়ছিল, টিনের চালে মৃদু শব্দ হচ্ছিল- টিপ, টিপ, টিপ। নিয়মিত। একটানা। যেন কেউ দরজায় কড়া নাড়ছে, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে চাইছে না। স্ত্রী পাশে ঘুমাচ্ছে। নিশ্বাসের শব্দ নিয়মিত, নিশ্চিন্ত। আমার ঘুম নেই। মাথার ভেতরে বারবার ঘুরছে ফুলমতির মুখ। লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া সেই মুখ। কলপাড়ের ভেজা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা সেই শরীর। আমাকে দেখে তড়িঘড়ি ঢেকে নেওয়ার সেই মরিয়া চেষ্টা। আমার মনে হলো- এই লজ্জাটুকুই তার শেষ সম্পদ। এটুকুই বাকি আছে। বাকি সব গেছে। অথবা যাচ্ছে। অথবা যাবে- এই চেয়ারম্যানের বাড়িতে থাকতে থাকতে, ধোঁয়াভরা ঘরে চা দিতে দিতে, রাতের পর রাত এই মানুষগুলোর হাতের কাছে থাকতে থাকতে। মানুষ কীভাবে পারে? প্রশ্নটা মাথায় আসে, কিন্তু উত্তর পাই না। কারণ প্রশ্নটার উত্তর নেই- অথবা উত্তরটা এত সহজ যে মানুষ সেটা স্বীকার করতে চায় না। মানুষ পারে, কারণ পাশের মানুষটা চুপ থাকে। আমার মতো মানুষ চুপ থাকে। দোয়া-দুরুদ পড়তে পড়তে ঘরে ফিরে যায়। তার পর শুয়ে থাকে। ঘুমাতে পারে না। আমার বহু দোষ- এটা আমি জানি। কিন্তু এই বিশেষ দোষটার কথা আগে কখনো ভাবিনি। ভাবিনি যে, না করাটাও একটা করা। চুপ থাকাটাও একটা কথা বলা। পরদিন সকালে দেখলাম ফুলমতি উঠানে ঝাড়ু দিচ্ছে। রাতের কোনো চিহ্ন নেই তার মুখে। শুধু চোখের নিচে একটু কালি, ঠোঁটের কোণে একটু শুকনো ভাব। সে ঝাড়ু দিচ্ছে একমনে, নিচুমুখে। হাতের ঝাড়ুটা পুরোনো, আঁটি বাঁধা খড়ের একটু একটু করে পড়ে যাচ্ছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। কী বলব ভাবলাম। কিন্তু কিছু বলার ছিল না। এই গ্রামে, এই সকালে, এই মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বলার মতো কিছু নেই আমার। ফুলমতি একবারও মুখ তুলল না। কিন্তু থামল। ঝাড়ু দেওয়া থামল। এক মুহূর্তের জন্য। যেন টের পেল কেউ দাঁড়িয়ে আছে। যেন অপেক্ষা করল- কেউ কিছু বলবে কি না। আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। সে আবার ঝাড়ু দিতে শুরু করল। আমি হাঁটতে লাগলাম। পেছন ফিরে তাকালাম না। কিন্তু পেছনে ঝাড়ুর শব্দ আসতে থাকল- একটানা, ক্লান্ত, নিরবচ্ছিন্ন। এই শব্দটা আমার পায়ের সঙ্গে সঙ্গে আসছিল। আমি যত এগোলাম, মনে হলো শব্দটা তত জোরালো হচ্ছে। বাড়ি পৌঁছে দরজায় হাত দিলাম। ঝাড়ুর শব্দ তখনো কানে আসছে। অথচ চেয়ারম্যানের বাড়ি অনেকটা পেছনে। এই শব্দ, বুঝলাম, আর থামবে না। সে রাতের পর অনেকদিন কেটে গেছে। ফুলমতিকে আর দেখিনি। চেয়ারম্যানের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। লোকমুখে শুনেছিলাম, একদিন মেয়েটা নাকি চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। কেউ জানতেও চায়নি। চেয়ারম্যানের বাড়িতে নতুন একটা মেয়ে এসেছে- বয়স ষোলো হবে। নাম নাকি সোনিয়া। আমি কথাটা মান্নানের দোকানে চা খেতে গিয়ে শুনেছিলাম। যে বলছিল, সে এরপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল- ধানের দাম, সারের দাম, আসছে বর্ষায় চরে কতটুকু জমি ডুববে। আমিও মাথা নাড়লাম। কিন্তু রাতে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুতেই সেই ঝাড়ুর শব্দ আবার কানে এল। ফুলমতি কোথায় গেছে- এই প্রশ্নটা মাথায় আসে মাঝে মাঝে। তার পর চলে যায়। তার পর আবার আসে। আমি জানি, এই প্রশ্নের উত্তর কোনোদিন পাব না। হয়তো পেলেও কিছু করার নেই। হয়তো করার ছিল- কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে গেছে। পেয়ারা গাছের পাতা থেকে জল পড়ে, শুকায়, আবার জমে। কেউ মনে রাখে না। এই গ্রামে সবকিছু এভাবেই চলে। আমিও চলি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় দোষ- এটা আমি জানি। কিন্তু জেনেও কিছু করি না। হয়তো এই না করাটাই একদিন আমাকে শেষ করবে। ভেতর থেকে। আস্তে আস্তে। কেউ টের পাবে না। অনাগত সন্তানের পিতা কে সেটা ফুলমতি ছাড়া কেউ জানে না।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একান্ত ব্যক্তিগত চিঠি || শফিক নহোর

 প্রিয় মেঘবালিকা, বৃষ্টিভেজা এই অলস দুপুরে জানালার পাশে বসে আছি। চারপাশে এক অদ্ভুত সুনসান, কেবল রিমঝিম শব্দে বৃষ্টি যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছে। আর আমি? আমি এই বৃষ্টিস্নাত নির্জনতায় হারিয়ে যাচ্ছি তোমার স্মৃতির ভেতর—ধীরে ধীরে, গভীরভাবে এ এক গভীর প্রেমের নিঃসঙ্গতায় তুমি জুড়ে থাকো আমায়। আজকের এই চিঠি কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়, এটি আমার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। এমন এক হৃদয়, যা আজও শুধুমাত্র তোমার ছায়া খুঁজে বেড়ায় প্রতিটি বাতাসে, প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। জানো, এই বৃষ্টির দিনগুলো কেমন যেন তোমার মতো হয়ে যায়—নরম, গভীর, আর অনির্বচনীয়ভাবে আবেগে পূর্ণ। তোমাকে মনে আছে সেই এক বিকেল? তোমার চোখে সেই অসমাপ্ত গল্পের ভাষা ছিল, যা আমি বুঝতে চেয়েও বোঝার সাহস পাইনি।  তোমার পরনে ছিল নীলরঙা পোষাক, ঠোঁটে ছিল মৃদু হাসি—যা দেখলেই মনে হতো, পুরো দুনিয়া যেন থেমে গেছে কেবল তোমাকে দেখার অপেক্ষায়। তুমি তখন খুব সাধারণভাবে বলছিলে, "আজ আকাশ ভীষণ মনখারাপ করেছে..." আমি চলে যাবো। আমি চুপ রইলাম। ভেতরে ভেতরে বলতে ইচ্ছে করছিল, "না, আকাশ না, মনখারাপ করেছি আমি—কারণ আমি তোমার মনের জানালায় ঢুকতে পারছি...

The Nomira || Shafiq Nohor

A shadow lingers though the light has gone. I walk alone, though I once belonged. Close was your voice, yet far was your heart. We stood together, still worlds apart. I burned in silence, turned to gold, Yet you cast me off—uncared, cold. I reached for truth, found only pain, Loved you through loss, loved you in vain. Your absence echoes, sharp and deep, Even in dreams, I cannot sleep.

ছোটগল্প : মৃত বৃক্ষ।। শফিক নহোর

অনেকদিন ধরে বোয়ালমাছ খাবার বায়না ধরেছে মিনু, ও চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা । আজ চলতি মাসের একুশ তারিখ । হাতের অবস্থা বড়ই নাজুক । মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, বেতন হাতে পেলে তুমি যা-যা খেতে চাও? সব এনে দিবো ,চিন্তা করো না। ‘এখন খাবার দাও ?' আমার অফিসে যাবার সময় হলো । ভিলেন মার্কা অভদ্র একজন অফিসার আছে ,সবসময় মানুষের পিছনে একটা পিন বিধিয়ে দেবার পায়তারা চলে অবিরাম ।‘কাকে কি ভাবে পিন দিবে !'আস্তাগফিরুল্লাহ মানুষ কী তাই এত খারাপ হয় । এ অফিসে চাকরি না হলে হয়তো বুঝতাম না ।সকালে বউ রসুনের পাতা দিয়ে টমেটো ভর্তা করেছে ,আহা কি স্বাদ ।গরম ভাতের সঙ্গে হালকা একটু বলরাম কাকার হাতের তৈরিকরা ঘি, ঢেলে নিলাম ।স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে-গেল ।বউ আমার পিছনে দাঁড়িয়ে বলছে, - এই শুনছো, -হ্যাঁ বল, -আমাদের তো একদিনও চিড়িয়াখানা নিয়ে গেলে না । এ সময় চিড়িয়াখানা যেতে নেই । লোকমুখে শুনেছি , ছেলেমেয়ে দেখতে না-কি বানরের মত হয় । ও আল্লাহ্ তুমি এসব কি বলও ।হুম সত্যি বলছি গো বউ ।তা না হলে তোমাকে নিয়ে যাবো না কেন ? তুমি আমার একমাত্র আদরের লক্ষীসোনা বউ । আমার খাওয়া শেষ, বউয়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছে খাঁটের উপর বসলাম । বউ আমা...