'বড়খাঁপুরের মানুষজন কী
বিচিত্র ধরণের কেউ-কেউ বলে , তাঁরা নাকি চুলার ভেতরে ঠ্যাঙ দিয়ে ভাত রান্না করে ।'
অবাক হবার কথা , আমি নিজেও
অবাক হলাম ! বিষয়টি খুব সহজে নিতে পারিনি প্রথমে । এটাও কি সম্ভব , কী করে মানুষ এমন
করতে পারে । কোন আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে আসলে না খাইয়ে দুপুর পর্যন্ত রাখবে । সকালবেলা
নদীর ধার দিয়ে হাঁটছি ; আশেপাশের লোকজন খোলা-মাঠে প্রকৃতির কাজ সেরেছে , চরম দুর্গন্ধ আসতে লাগল মৃদু বাতাসের সঙ্গে ।নাকে হাত চেপে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম
।
গ্রামীণ মানুষ গুলোর সহজ
সরল সমীকরণ খেয়ে পড়ে কোনো মতো দিন পাড় করতে পারলে-ই বেঁচে যায় । কে- কাকে নিয়ে এত ভাবে
এখন । সে সময় কী মানুষের আছে এখন ?'
কারো কারো বাড়িতে বাঁশের
উঁচু পায়খানা , উপর থেকে ছাড়ছে নিচে নদীতে ভেসে যাচ্ছে সেই পানিতেই গোসল, বাসনকোসন
পরিষ্কার থেকে শুরু করে নানান কাজ । বাচ্চাকাচ্চা কেউ-কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে দিনের
পর দিন পরে আছে । অভাবের সংসারে একজন বেশি দিন অসুস্থ হয়ে থাকলে , ‘ মনে হয় মরে গেলেই
শান্তি আহা রে ! গরীব মানুষের জীবন ।'
অসহায় মানুষ নদী ভাঙ্গন
পরিবারের কাছে কি সবসময় নগদ টাকাপয়সা থাকে
তা থাকে না । হাজারী সাহেব চেয়ারম্যান মানুষ , সরকারি পয়ঃনিষ্কাশন সেনেটারী আসছে
; তা সব সুর্যনগরের রাক্ষসদের পেটের ভেতরে গোল্লাছুট খেলছে । অসহায় দুখী মানুষ না খেয়ে
দিনপাত করছে । কারো জন্য কোন মায়া মমতা কাজ করে না এখন । মানুষজন রোবট হয়ে যাচ্ছে দিনদিন।কেউ
কারো নিয়ে ভাবে না ।
-কিডা গো গফুর না কি রে
?'
- শমশের ভাই তুমি এত সকালে
নদীর পাড় , কোন কাম কাজ আছে না কি ?'
- নারে , শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা
, একটু হাঁটতে আসছিলাম ,
নদীর পাড়ের যে অবস্থা , চল বাজারে গিয়ে এককাপ চা
খেয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেই ।' এখানে বেশিক্ষণ থাকলে এমনিতেই অসুস্থ হয়ে যাবো ।
-গফুর শুনলাম , শুকুর মাঝির
মেয়ে বট তলায় ফাঁসি নিতে গিয়ে ধরা পড়ছে ; লোক মুখে তো তাই শুনছি , মাগি মানসীর মন বুঝা
আর আর নদীর ঢেউ বুঝা বড়ই কঠিন কোন তীর থেকে আসলো এ ঢেউ ।
- ঠিকই কইছো ভাই ,
-আজ একটু চেয়ারম্যান সাহেবের
বাড়ি যাবো , যেয়ে কোন লাভ হবেনা জানি । বাড়ি ভর্তি দফাদার , মাগি চাষ হয় কাজের মেয়েদের
দিয়ে । হরহামেশা শুনি, এ মাসে ও দুইজন জারিপেট ফেলতে আসছিল , সরকারি হাসপাতালে । খারাপ
কাজকাম করবার আগে , দুই পাতা মায়া বড়ি নিয়ে রাখলেই ত হয় । পাপ ও করবে , আবার মানুষও
খুন করবে কোন বিচার নাই । পাপ কাজে সমাজটা নষ্ট হয়ে গেল । কানের কাছে লোকজন ফিসফিস
করে বলে গেল । সুমনের বোনের না-কি ?' কিডা যেন মোবাইলে ন্যাংটা ছবি তুলে ব্লুটুথ দিয়ে
জনে-জনে বিলচ্ছে , খানকির পোলা পানের লেখাপড়া নাই ,কামকাজ নাই , সারাদিন মাগি ভক্তি
।
সন্ধ্যা লাগলে হিন্দু পাড়ায়
, জুয়ার আসর , পরের ঘরে ঢিল ছুড়বে ।সুন্দরী মেয়ে দেখলে জানালে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ফায়দা
লুটতে চায় । সকালে আমার কাছে বিচার নিয়ে আসবে । চাচা আপনি মাতব্বর কিছু একটা করেন ।
বলতো গফুর , আমি কি করতে
পারি ?' আমি না চেয়ারম্যান , না মেম্বার । আজকাল না কি ? ' মেম্বাররা টাকা খেয়ে সালিশ
করছে , ‘ থানার দারোগা চেয়ারম্যানের বাড়িতে আসে ডাবের পানি খেতে , মাসে মাসে তার নতুন
ডাব লাগে ।'
যা শুনলাম , দারোগার চরিত্র
এত নিচে নামছে ; সমাজ চলবে কেমনে । আইন শৃঙ্খলা যাদের হাতে তারাই মুলা ধরে রাখে সাধারণ
মানুষের চোখের সামনে ।
-তা শুকুর মাঝির মেয়ে গলায়
ফাঁস দিতে গিয়েছিল কেন ?' মেয়েটি শিক্ষিত ,ভদ্র , মার্জিত , নম্র কেউ কিছু বলছে না—কি ?'
চল দেখি , শুকুর মাঝির
বাড়ি হয়েই যাই ।
ঘটনাটা আমাকে মানসিক ভাবে
খুব আঘাত করছে ,
-শমশের ভাই এভাবে ভেঙে
পড়বেন না ।
‘চারিদিকে যা দেখছি , এমন
একটা দেশ তো আমি চাইনি এই জন্য তো আর দেশের
জন্ন্যি যুদ্ধ করিনি । চারিদিকে রাঘব বোয়াল হা করে থাকে , কখন কাকে খাবে ।' এখন সমাজে
সংসারে সব খাওয়ার মানুষ যাকে তাকে কখন যেন গিলে খাবে ।
আসসালামু আলাইকুম মাস্টার
কাকা ,
-এই তুমি কি শুকুর মাঝির
মেয়ে ?'
-জ্বী! কাকা ।'
-তোমার বাবা কি বাড়ি আছে
?'
-বাবা তো আজ ক'য়েকদিন হয় , নৌকা নিয়ে নারানগঞ্জ গেছে , পোদ্দার বাড়ির
পাট বোঝাই নৌকা নিয়ে । দাঁড়িয়ে আছেন ক্যান , কাকা ভিতরে আসেন ?'
-শুনলাম , তুমি নাকি গলায়
ফাঁস দিতে চেয়েছিলে ?'
-কাকা আমি মিথ্যা বলি না
, জ্বী, আমি গলায় ফাঁস নিতে গেছিলাম । মানসীর জন্ন্যিই মরবির পারিনি ।
-জীবনের প্রতি তোমার এত
মায়া কম ,আমার বয়স হয়েছে , তাও খুব বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে ।পৃথিবীটা কত সুন্দর দেখ
।
-আর তুমি ছোট মানুষ । এত
অল্প বয়সে মরে যেতে চাও ?'
-আমি বি এ পাশ করছি কাকা
, চাকরি টাকরি হচ্ছে না । যেখানে যাই , সেখানেই কুয়া কেটে ব্যাঙ আনার মত অবস্থা । পুলিশে
লোক নিবে , চেয়ারম্যান সাহেবকে বলেছিলাম , উনি বললেন,
দারোগার সঙ্গে আমার ভাল
সম্পর্ক একদিন বাড়িতে আয় , দারোগার সঙ্গে পরিচয় করে দিব । দারোগা বেটা শয়তানের একশের
। এর চেয়ে বেশি কিছু আপনাকে বলা যাবেনা কাকা । আমার থেকে সে ফায়দা লুটতে চায় ।
-ছি: ছি : থাক থাক , আর
বলতে হবে না । আমি যাই রে মিনু ।
প্রকৃতির অপরূপ রূপের সাগরে
ভেসে আসে আমার হারানো যৌবন , বট বৃক্ষের মতন দাঁড়িয়ে থাকে আমার অলস-দুপুর , সাঁঝের
বেলায় বাড়ি ফেরা যুবকের বুক পকেটে থাকে তিলে খাজা , আমার জন্য অর্ধেক খেয়ে না খেয়ে
যে মানুষটা ঘোষ বাড়ির শ্মশান ঘাটে পাড় হয়ে পুরাতন বট গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতো , সেই
মানুষটা আমাকে এভাবে ধোঁকা দিতে পারে , না— কি আমার কোথাও ভুল হচ্ছে ।
মিলন তো কখনো এমন ছিল—না । আমার সঙ্গে মিলনের কি-না হয়নি ।
শুধু আমাদের বিয়ে হয়নি , সংসার করছি না । এই দেহের প্রতিটি রক্ত কণিকায় মিলনের চিহ্ন
আমাকে বিষের বেদনায় নীল করে দেয় । বট বৃক্ষের ঝড়ে পড়া পাতার মত আমি পরে আছি , অভাবী শুকুর মাঝির সংসারে । কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার
বিমর্ষতা-পূর্ণ চাহনিতে পরাজিত হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিষ সাপের ছোবলের তীব্র বেদনা
। আমার জন্য বাবা কিছুই করতে পারেনি । মা প্যারালাইসিস হয়ে ক'বছর ঘরে পরে আছে । ইচ্ছে
থাকলেও আমাকে বিয়ে দিতে পারছে না । বাবা নিজেও আর একটা বিয়ে করছে না । মা আমাদের মাঝে
বেঁচে থাকার চেয়ে এখন মরে যাওয়া অনেক ভাল ।
অন্তত দুটি মানুষের জীবন
মুক্ত পাখির মত ডানা মিলে আকাশে উড়তে পারত ,
হাতে মিলনের দেওয়া চিরকুট
পেলাম । আজ রাতে আমারা পালিয়ে বিয়ে করবো , রাতে বট গাছের নিচে থাকতে বলছে , আমাকে ।
আমি মাকে ফেলে কেমন করে যাবো ?' এদিকে আমার পেটে অনাগত একজন । নয়-ছয় ভাবতে-ই মিলন দরজায়
কড়া নাড়ার শব্দ ।
দরজা খুলতে-ই মিলন ,
-ফিসফিস করে বলছে , এত
দেরি করছো কেন ?'
-তাড়াতাড়ি আসো , তোমার
সঙ্গে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে ।
- একটু দাঁড়াও ! ব্যাগটা
নিয়ে আসছি ,
- ব্যাগ লাগবে না , এমনি
আসো ?'
- মানে কি ?' ব্যাগ লাগবে
না কেন ?'
- দু’ঘরের মাঝখানে যেতেই
পায়ে আঘাত পেলাম , মিলন আমার হাত ধরে টেনে ধরতে চাইল । আমি তার আগেই উঠে গেছি , ঝিরঝির
বাতাস , নদীতে নতুন জোয়ারের পানি আসছে , শত বছরের বট গাছটির নিচে বসলাম দু’জন ।
আমাকে আলতো আলিঙ্গন করে
মিলন বলছে ,
-একটা গুড নিউজ আছে , আমি
পুলকিত হলাম ।
-আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম
কি ?' গো সেই গুড নিউজ ।
-আমার চাকরি হয়েছে পুলিশের
। আগামীকাল সকালে ঢাকা যাবো ।
-তোমার পেটে কার বাচ্চা
, ঐ চেয়ারম্যানের না কি দারোগার ?'
-এসব ভেজালের ভিতরে আমি
নেই ।
-আমার একটা চাকরি হয়েছে
, আমি তাতেই খুশি । আমার চোখ ভিজে উঠছে , অন্ধকার আরও গাঢ় হল , ঠিক নিজেকে দেখা যাচ্ছে
না । পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি মিলন নেই , এই বটবৃক্ষ আমাদের প্রেমের সাক্ষী ছিল ।, নিশীথের
আলিঙ্গনের সাক্ষী ছিল । শত বছরের পুরাতন বট বৃক্ষটি নদীর বুকে আত্মসমর্পণ করছে ধীরে-ধীরে
, আমি থেকেই কি হবে ?'
শুকুর মাঝি , ঢাকা থেকে
পাটের খালি নৌকা নিয়ে দৌলতদিয়া ঘাট পার হয়ে সামনে আসতে-ই , একটা মানুষ বাঁচার জন্য
চেষ্টা করছে , দূর থেকে আলো আঁধারের জন্য মুখ ঝাপসা দেখা যাচ্ছে । নৌকা একটু ধীরে নিতে
বলল , একটা দরি ফেলে দিলাম পানিতে , ব্যর্থ অসহায় হাত সে দরি ধরতে পারেনি । উপর হয়ে
ভাসছে , ' শুকুর মাঝি দেখছো এটা কিন্তু মেয়ে মানসীর লাশ ! মেয়ে মানুষ পানিতে ডুবে মরলে
উপর হয়ে লাশ ভাসে ।' জানটা মনে হয় এখনি বের হলো দেখছো মাঝি ?'
সামাদ ভাই , তুমি নৌকার
হালটা ধরো আমি একটু পানিতে নেমে দেখি ….!
সামাদ দেখছিস ভাই , আমার
চাঁদ নদীতে ভাইসা আসছে , চিৎকার শুনে নিচে নামতেই অন্ধকার শুধু নদীর ঢেউ । আমি আর কিছুই
দেখেনিসে জলের ভেতরে ।
এ গ্রামে এত শিক্ষিত মানুষ
, কত বড়-বড় অফিসার , কেউ একটা পুরাতন বটবৃক্ষ বাঁচাতে পারেনি । সকালে সবাই জানতে পারল
বড়খাঁপুরের পুরাতন বটবৃক্ষ নেই , নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে ; ভেসে গেছে শুরুর মাঝির
পরিবার , ছোটছোট পাপ গ্রামে ঢুকলে কোন-কোন মানুষের উপর তা পরে । মানুষের ঊর্ধ্বে কিছু
নেই । শুধু আমরা আমাদের অহংকার , আর মায়ের মতো পুরাতন একটি বট বৃক্ষের কাছে হেরে গেলাম
।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন