ছোট্ট গল্প : ফ্রক/ শফিক নহোর
শীতকালীন সময়ে রাজশাহী থেকে শাপলাদের বাড়িতে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করবার জন্য বিভিন্ন লোকজন আসত, তখন কুড়ি-চল্লিশ খেজুর-গাছ ছিল তাঁদের কিন্তু তা জবরদখল করে খেত, তাঁর চাচা রফিক মেম্বার । শাপলার দাদার চোখে ছানি পড়েছিল, রফিক মেম্বার চক্রান্ত করে ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস থেকে তাঁর বাবাকে চোখের ছানি অপারেশন করবে বলে একদিন থানা শহরে নিয়ে গিয়ে বাড়ির জমি বাদে সব নিজের নামে লিখে নিয়েছিল সুকৌশলে ।
-'বাজান আজ ডাক্তার আসেনি , কাগজ পত্র কিছু সই সাক্ষর করে পরবর্তী একদিন আসতে হবে ।'
-ডাক্তার
বেটারা ফাঁকিবাজ ঠিক মতো আসে না চেম্বারে !'
- বাজান আজ চলে যাই ,
- বেলা ত অনেক হয়েছে মনে হয় ।
- যোহরের
আযান দেয়নি, এক্ষুণি দিবে ।'
- চল বাজান, বাড়ি যাই ; বাড়ির বাহির হইলেই মনে হয় কব্বরে চলে গেছি ।'
- বাজান,
সংসারের মায়া বড় কঠিন মায়া । সংসার ছাইড়া কোথাও যাইতে ইচ্ছে করে না আমারো ।
- বাজান মার, কব্বরটা পাকা করে দিলে ভাল হয় ; তোমার চোখের অপারেশন করবার পর দেইখো আমি মার কব্বর পাকা করে দিবো ।
- তুই আছিস বলেই , আমি ভরসা পাই ।
- বাজান মন খারাপ কইরো না ,মায়ের কথা
কইয়ে তোমারে মন খারাপ করে দিলাম ।
শাপলার মা আমাদের পাশের বাড়ির বউ ।আজ ক'য়েক বছর দেখছি স্বামী , সংসার আর ছোট একটা মেয়ে নিয়ে বেশ অভাব অনাটনে সংসার করছে ; কখনো কখনো তাদের মধ্যে কথা হতো;
-'সারাদিন
জুয়া খেলে কয় টাহা কামাই করো শুনি ?'
- মাগি কথা কবু লয়, কথা কলি, খুন করে ফেলবো ।
- মিনশির
যুত নাই , পাইছে খুন করে ফেলবো , সংসারটার দিকে তো কুনু খেয়াল নাই ,
মেয়টা দেখে রাখলে তো দাসীবাঁদী খেটে খাবার আনতে পারি , তোমার কি সে মুরোদ আছে । জানি নাই , কী করে থাকবে । আছো তো সারাদিন জুয়া খেলা নিয়ে ।থাকলে কেউ বউয়ের লাথি-গুড়ি খেয়ে কুত্তার ল্যাহান পড়ে থ্যাহে । বদজাত হারামি কোথাকার ?' জীবনটা আমার ধ্বংস করে ফেলল ;
ফরিদা রক্তাক্ত চোখে সোহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বিড়-বিড় করতে করতে বাড়ির বাহিরে চলে গেল ।
মেয়েটি খালি গায়ে বাবার পেছনে পেছনে যেতে লাগল,
-'কুত্তার
বাচ্চা , আমার পিছনে পিছনে আসছিস ক্যান , তোর মায়ের লগে যা ।'
শাপলা দাঁড়িয়ে রইল, চোখের ভেতর জল ছলছল করছে , বাবার মুখের দিকে মায়াবী চাহনি দেখে সে চোখ ফেরানো ছিল বড় কষ্টের । তবুও বাবার হৃদয়ে প্রেম জেগে ওঠেনি । সংসারের অভাবে প্রেম থাকে না , মায়া থাকে না , কোন আবেগ কাজ করে না সেখানে মানবিক হয়ে কী এমন হবে ?'
জুয়াড়ি মানুষের মনের ভেতর মানুষ থাকে না থাকে জুয়াড়ি খেল শুধু জিতে যাবার ভাবনা !'
ফরিদা শাড়ির আঁচল হাতে নিয়ে জোড়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে কাঁদের উপর ফেলে , পান খেতে খেতে সে নিজেও বের হল কাজের জন্য ।'
শাপলা, জন্ম নেওয়ার পর , নাম রাখা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সে কী তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছিল , তার বয়স এখন সাতবছর ছুঁই ছুঁই করছে ; 'ভারি মিষ্টি মেয়ে
এ যেন গোবরে পদ্মফুল ।'
সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে যখন বাড়ি যাবার জন্য বের হলো , তখন গৃহকর্তা ফরিদার হাতে কলারপাতায়
কিছু খাবার দিয়ে দিল ।খাবার পেয়ে মনের ভেতরে আনন্দে চোখের কিণার দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল নিজের অজান্তে । মেয়েটা মাংস খেতে চায় , কতোদিন মাংস দিয়ে ভাত খায় না আজ দু'জন একসঙ্গে খাবো ।'
ভেজা চোখে আনন্দে বড়বাড়ির বাহিরে এসে মাথার উপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে থাকে ফরিদা । শাড়ির আঁচল দিয়ে ডেকে নেওয়ার চেষ্টা
করছে ; পেছনে-পেছনে একটি নেড়ি কুত্তা
গা বেয়ে উঠতে চেষ্টা করছে ; কখনও আবার লেজ
নেড়ে নেড়ে সামনে আসছে ।
হাতের খাবারের দিকে ঝুঁকে আসছে । কামড় দিবে ঠিক এমন অবস্থা ।
মিহি গলায় বলছে,
- ধুর , ধুর ...! যা কুত্তা ।
কুত্তাকে তাড়ানোর চেষ্টা করল , কিন্তু খাবারের ঘ্রাণ
পেয়ে পিছনে পিছনে যেতে লাগল ।
কিছু দূর যাবার পড়ে আরো একটি কুকুর
খাবারের ঘ্রাণে পেছনে ছুটতে লাগল , কিছু দূর যাবার পড়েই কুত্তা লাফ দিয়ে উঠে খাবারের পুটলা কেড়ে
নিল , রক্ষা করবার চেষ্টা করল তবুও ব্যর্থ হয়ে পড়ল ফরিদা ।
কুত্তা দুটির খাবার দৃশ্য দেখে ফরিদা চোখের
জল ছেড়ে দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ ।
পাশথেকে আর একটি কুত্তা এসে মানুষের মতন কাঁদতে লাগল ; ফরিদা অবাক! হয়ে কান্নার ভেতর
ডুবে গেল ।' তাঁর কাছে মনে হচ্ছে শাপলা তাঁর শাড়ির
আচল ধরে বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য বায়না
ধরেছে । 'কুত্তা গুলোর খাওয়া শেষে হাঁক ছেড়ে হুউ, কুউ, মুউ করে চিৎকার করে বলছে ;
মনে হচ্ছে,
'বহুদিন
পরে পেট ভরে খেতে পেরেছ ,
সেই আনন্দ প্রকাশ করেছে ।'
কিছুক্ষণ পরে মসজিদ থেকে মাগরিবের
আযান ভেসে আসল , ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আঁধারে পথচলা কঠিন হয়ে গেল ।
এ পথ মায়ের বুকের মতো কত আপন কতো
পরিচিত , তবুও মনে হচ্ছে এ পথের প্রথম যাত্রী আমি । আশেপাশের পরিবেশ অপরিচিত ভৌতিক ।
মেয়ে ঘরের বারান্দায় জলচৌকিতে বসে , কেরোসিনের বোতল থেকে কুপিতে তেল ভরছে ; আমাকে দেখে সামনে এগিয়ে এসে আবার দাঁড়িয়ে গেল । মনে হল কিছু একটা বলতে চেয়েছে ; কিন্তু হাত খালি দেখে মন খানা ভারি করে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল নি:শব্দে ।
- 'শাপলা ঘরে গেলি ক্যারে মা ?'
- তোমার না খাবার নিয়ে আসবার কথা ।
- সব কথা কি সবাই রাখে ।
- 'তুমি মা , তুমি তো রাখো ।'
- তা ঠিক কইছিস , তুই কুটি মানুষ ভালই তো জ্ঞান হয়ছে রে গেদি ।
- মা তুমি না আমার কইছো ঈদে ফ্রক জামা কিনে দিবা। সবসময় তো খালি পুরানো জামা-কাপড় দাও ক্যান । আমরা কি খুব গবীর মানুষ মা ।'
-বড় মানসীর সঙ্গে এতো কথা কওয়া লাগে না রে বেটি ।
- মা দেখ ?' আমার না বুক ব্যথা করে ।
-'ব্যথা করে ক্যান ?'
- ব্যথা করবে না , তুমি বাড়ি না থাকলে রেজা কাকা বুক খুব জোড়ে ধরে ,
'বলে কাউকে বলিস না ।' তোকে চকলেট কিনে দিবো ।
রেজা কাকা বলছে ,
-তোর বুক বড় হলে দেখিস তোর মা তোর তাড়াতাড়ি ফ্রক কিনে দিবে ।
-আমার ব্যথা লাগে তবুও কিছু বলি না ,কও না, মা' কবে ফ্রক কিনি দিবা ।
-মা আমার দুধ না কী লিচুর মতো ছোট । যখন গাব গাব হবে তখন নাকি লোকে আমারে খুব দাম দিবে । সুন্দর জামা পরতে পারবো ।
-আচ্ছা
, মা লোকে আমারে দাম দিবে কি ভাবে ?
- ও মা তুমি কাঁদছো ক্যান গো , তোমারে কি কেউ কিছু কইছে , আল্লার কিরি মা , মাথা ছুঁয়ে কচ্ছি , জীবনেও আর কোনদিন তোমার কাছে ফ্রক কিনার কথা কবো নানে ।
ফরিদা রাতে বিছনায় শুয়ে ভাবছে , মেয়েটার বুক উঠতে শুরু করছে , এ বয়সে খালি গায় থাকলে স্তন দ্রুত বাড়ে না । সাত পাঁচ ভেবে পুরান জামাও মেয়েকে দেয়নি । জমা পরা শুরু করলে স্তন ওঠে গেলেই জামা দিতে হবে । অভাবের সংসার । বুকের সাইজ সদ্য লিচু হয়েছে তবুও কলপাড়ে খালি গায় যায় । হাত বুকের সঙ্গে লাগিয়ে একহাত দিয়ে মাটির ছোট হাড়ি ভরতে চেষ্টা করছে শাপলা । রেজা সুযোগ খুঁজছে ; বুকে হাত দিতে । ফরিদা কলপাড়ে এগিয়ে এসে বললো,
-দেখতে তো মানুষ হয়ছো , ভেতরে শয়তান ।
মেয়েটা কুটি মানুষ , তার বুকে হাত দিতে লজ্জা করে না । বিচার দিবো কার কাছে চেয়ারম্যান দুইদিন ঘরে টুকা মারছে ।
-ভাবি কি কিছু কচ্ছেন , আমারে ।
- হাতে বটি দেখছিস , একবারে গলা নাবায়া দিবো খানকির ছাওয়াল ।
জুয়ার আসর থেকে বাড়ি আসছে সোহান আজ সারাদিন বৃষ্টি ভোরবেলা থেকে । জলখাবার খেয়ে বের হয়েছিল সোহান । ঘরে এসে বউরে কাছে আসবার জন্য ইঈিত করল ,
-আজ তোমারে অন্য রকম লাগছে । কারণ ডা কি কও তো দেহি ।
- বউ তুমি কি ব্লু ফ্লিম দেখচু , কখনো ।
- ছিঃ ছিঃ এসব কথা কও ঘৃন্না লাগে না ।
- ও আল্লা কও কি ?
- তোমারে
আজ রাতে একটা নতুন উপহার দিবো ।
- কি উপহার দিবা কও দেহি ।
- রাতে দিবো রাতে শাপলা ঘুমিয়ে গেলে ।
-শয়তান মানুষ কি ভাল হয় । তোমার মতলব আমি বুঝেছি ; ভেংচি কেটে ফরিদা একটু দূরে দাঁড়াল ।
তবুও কবুতরের মতন ধরে ফেললো সোহান ,
-'আস্তে মেয়ে দেখে ফেলবে । '
‘তুমি দেখছি বিদেশি মানুষের মতন শয়তান হয়চু ।'
রেজা লাল রঙের একটা ফ্রক নিয়ে এসেছিল । শাপলাকে দেখিয়ে নদীর দিকে নিয়ে গেছে ; ঐদিকে স্বামী স্ত্রী আদিম নেশায় মগ্ন তখন ।
শাপলা আর কখনো বাড়ি ফিরে আসেনি , সেদিনের পর থেকে । গ্রামের মানুষ জানাজানি হল । থানা থেকে পুলিশ এসেছিল ।
শাপলার মায়ের কান্দনে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল-
ফরিদা প্রতি বছর নতুন ফ্রক কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে । মেয়ে ফিরে আসবে এ আশায়। চোখ আষাঢ় মাসের মতন জলে ঢেউ খেলে ফরিদার ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন