সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভাইভাগ || শফিক নহোর ||


ভাইভাগ

শফিক নহোর


আমার জন্ম হয়েছে পাবনা জেলার সুজানগর থানাধীন নওয়াগ্রাম শেখ পরিবারে , ছোট বেলা থেকে আমি মন মরা হয়ে থাকতাম কারো সঙ্গে তেমন কথা বলতাম না । আমার তেমন ভাল বন্ধু কেউ হতে পারেনি । আমাদের বাড়ির পাশে পোদ্দার বাড়ি সেখানে খুব বড় একটা জঙ্গল ছিল । আমি প্রায়-দিন রাতে একাই জঙ্গলে চলে যেতাম , এবং আসবার সময় বিভিন্ন স্বর্ণ অলংকার নিয়ে বাড়িতে আসতাম । মা এ সব একদম পছন্দ করতো না ।মা বলতো তোর অমঙ্গল হবে রাজা তুই কখনো যাবি না   জঙ্গলে । মায়ের মন বলে কথা । আমি মাকে সান্ত্বনা দিতাম কিন্তু কোন লাভ হতো না ।সকালে ঘুম থেকে উঠে মা বাড়ির কাজে ব্যস্ত হয়ে যেত ; আমি আমার সমবয়সীদের সঙ্গে বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করতে গেলেও আমাকে কেউ খেলায় নিতে চাইতো না ।আমার কান পচা ছিল বলে , সংসারের অভাব ছিল না কিন্তু অবহেলা ছিল আমার প্রতি । বাবা আমাকে মোটেও সহ্য করতে পারতো না ।আমার অপরাধ কি আমি জানি না । বাবার না কি খুব আউশ ছিল আমার একটা ভাই থাকবে । আমার যমজ ভাই হয়েছিল কিন্তু চেহারা মানুষের মতো না দেখতে । কেমন বলে একটা ছোট পোকার মতো মা , বলে ছিল এতোদিন পেটে ধরেছিলাম ঠিকই একজন মা বলে ডাকে একজন সেই যে চোখের আড়াল হলো  জনমের মত । ওরে আর চোখের দেখাটাও দেখলাম না  পরাণটা ওর জন্য কাঁদে । দাই বেটি মাকে বলেছিল , রুমা তোর না পেট থেকে রাক্ষুস না কি একটা সাপের মত জরায়ুর ভেতর থেকে বের হলো তখন তুই সব চেয়ে কষ্টে পাইছিস লো ম্যাগি ।
তোর স্বামীর তো সংসারে অভাব নাই শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে পারে । মানুষ মরে গেলে কি টাহা কব্বরে নিয়া যাবি । তোর কপাল ডা সত্যি লো খারাপ । যমজ বাচ্চা জন্ম দিলি । একটা সাপের মতো কিলবিল করে ঘরের ফাঁসা দিয়ে চলি গেলো আমি ধরবো আমার সারা হাতে রক্ত । বাড়ির বারান্দায় রফিকের মা  বাঁশের খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে পান চিবিয়ে আলাপ করছে , মায়ের সঙ্গে তাও অনেকদিন আগের কথা ।
 আমি পোদ্দার বাড়ি জঙ্গলে বিভিন্ন গাছের পাতা , বাঁশের পাতা কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে গেলে মা সেই গাছের পাতা দিয়ে ভাত রান্না করেতো আমি গাছের ডাল ভেঙে মায়ের হাতে দিলাম । মা দেখি ধাও ধাও আগুনের ভেতরে গাছের তাজা ঢাল দিলে মনে হয় গাছের ঢালপালা আরো সবুজ হচ্ছে । আমি মাকে বললাম মা দেখ , গাছের ঢাল কেমন তরতাজা হয়ে চুলার ভেতরে জ্বলছে , মা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলছে , কখনো মিথ্যা কবি না কচ্ছি আমাকে । তোর বাপের মতো হারামি হচ্ছিস দিনদিন । তোর বই দিলে চোখের দিকে তাকালে আমার কাছে অপরিচিত মনে হয় নিজের ছাওয়াল পলের প্রতি মানুষের মায়া হয় । ভালবাসে তো গরে প্রতি আমার বিতৃষ্ণা লাগে । গাছের পাতার মত মনের রস আমার দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছেরে রাজা ‘ আমি তোর মা না-কি  এ ঘরের দাসী বাদীর মতো খেটে গরু হলাম ।

পর্ব-২
বাবা বৃদ্ধ বয়সে এসে মায়ের পেটে আর একজন অনাগত পৃথিবীর আসামি রেখেই বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো ।সারাবাড়ি শোকের মাতম মা কেঁদে কেঁদে কখনো জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন । আমার চোখ ভেজা বাড়ি ভর্তি মানুষ সাপের মতো কিলবিল কিলবিল করছে , পেটে ক্ষুধা লাগছে কেউ এসে বলছে না । রাজা চল আমাদের বাড়ি যাই আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে খাবি । দিনদিন মানুষের প্রতি মানুষের সম্পর্কের সংকীর্ণতা দেখে আমার প্রচণ্ড লজ্জা লাগে । এর চেয়ে তো আমাদের বাড়ির উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে যে দরজার পাশে রাত জেগে আমাকে পাহারা দেয় নিঃস্বার্থ ভাবে আমি কী তাঁর কাছে ঋণী নই । হাড়হাবাতে মানুষ ভরে গেছে গলির পথ থেকে পোদ্দার বাড়ির শ্মশান ঘাট পর্যন্ত ।জোনাকি পোকার মত আলো নিভে আর জ্বলে বাঁশ ঝাড়ের পাশ দিয়ে বৃষ্টির দিনে সুরু পথ পিচ্ছিল পথ বেয়ে বিদ্যুৎ গতিতে একটা সাপ আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল ! আমি মাটিতে আছি না-কি বেহুশ হয়ে মাটিয়ে পরে গেছে ঠিক বুঝতে পারছি না ।কেউ একজন আমাকে বলছে , রাজা তুই এমন করছিস কেন? আমার চোখেমুখে পানির ছিটা দিয়ে বলবো আমাকে কে যেন এখানে থামিয়ে দিল । চারিদিকে ভাল করে দেখে আমাকে আবার বলছে , তোর মাথায় কি সমস্যা হলো । আমি জানি সাপ অদৃশ্য হয়ে গেছে । আমার সঙ্গে তার অলিক একটা মায়া কাজ করে , বিভিন্ন সময় সে আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে । আমি এ কথাটি কাউকে বলতেও পারি না । আমি একদিন স্বপ্ন দেখেছিলাম , সাপ তার জবান দিয়ে বলছে ,আমি তোমার ভাই খাজা ! মাকে  পরের দিন সকালে প্রশ্ন করেছিলাম ; মায়ের বিষণ্ণ চোখে পুত্র হারানোর বিবর্ণ? চাহনি আর ভেজা চোখের পাপড়ির জলোচ্ছ্বাস আমাকে জানান দেয় ।সাপ মানব আমার মায়ের ওরস জাত সন্তান ।                                                                                                                                             মায়ের নীরব ভূমিকা আমাকে আত্মদহনে ধাবিত করে । একটা সময় সংসারের হাল ধরতে হয় আমাকে । জমি জমা , টাকা পয়সা আমার একার রাজত্ব সেখানে কেউ এসে ভাগ বসাবে, আমার মন কোথা ভাবেই শায় দেয়নি । মানুষ আড়ালে আবডালে কানাঘুষা করে ,বাপ মা খারাপ কাজ করেছিল জীবনে তাই মধু শেখের বউয়ের পেটে সাপ জন্ম নিয়েছে ; এ কথা আমার কাছে গরম তরল কাঁচের মত মনে হয় কেউ আমার বুকে ঢালছে । মা জীবনে খুব কষ্ট করেছে , সংসার ছেলে-মেয়ে স্বামীর সেবা যত্ন । মনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করতো সবসময় । সত্যি সত্যি একদিন উঠোনে সকাল বেলা বারান্দায় ভাতে খেতে বসছি , পায়ের কাছে দিয়ে সাপ কিলবিল করে ঠিক প্লেটের কাছে এসে ফণা ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো । আমি মা বলে ডাকতেই মা সাপকে জড়িয়ে ধরল । ঠিক তখনি সে মানুষ রূপে রূপান্তরিত হলো।আকাশের নীল রঙ কেমন ফ্যাঁকাসে কালসে হয়ে গেল । পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ মিনিটে ম্লান হয়ে গেল ।চারিদিকে কেমন নিঃসঙ্গ
একটা পরিবেশ । বুকে আয় খাজা বুকে আয় আমি যখন তোকে পেটে ধরেছিলাম ; ‘ তখন থেকেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম । আমার যমজ সন্তান হলে তোদের নাম রাখবো রাজা, খাজা । এতদিন আমি শুধু মা হয়ে দোয়া করেছি তোর জন্য আমার পেট থেকে যে জন্ম নিয়েছে সে যেন ভাল থাকে । রাজা তো আমাকে মা বলে ডেকেছে কতো , এবার তুই আমাকে একবার মা বলে ডাক তে খাজা ।’
গ্রামের মানুষের ঢল নেমে গেলে বাড়ি । আমার মত ঠিক দেখতে , আমার মতোই তার কণ্ঠস্বর তাঁকে অবিশ্বাস করি কী ভাবে সে আমার ভাই না । জন্মের সাতাশটি বছর সাপের রূপ ধরে যে মানুষটি আমাকে পরিবারকে সাহায্য করেছে , তার কাছে ঋণী হয়ে আছি ।সারাবাড়িতে আনন্দের ঢেউ বয়ে চলছে , একদিন তো ভেবেছিলাম । বাবা মায়ের সয় সম্পত্তি সবকিছু আমার একার । কিন্তু আজ মনে হচ্ছে  এ সব আমার একার নয় । বাড়ি থেকে আমার বিয়ের জন্য মা বলতো এখন তোর বিয়ে করা দরকার এত বড়বাড়ি খালি খালি লাগে । মায়ের সে আবদার রাখতে গিয়ে নতুন বউ সংসারে আসতে না আসতেই জমি জমা নিয়ে শুরু হলো নতুন এক ফ্যাসাদ । জমিজাঠি নিয়ে সংসারে অশান্তি , ভাই থাকলে সম্পত্তি ভাগ হবে এটাই স্বাভাবিক এ নিয়ে পাশের বাড়ির কানাঘুষো আমাকে ভাই হত্যার মতো খারাপ কাজে নামাতে পারেনি । আমার ছোট ভাই মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি মায়ের পেট থেকে  কিন্তু ওর কথার বিষধর সাপের বিষের চেয়ে ভয়ঙ্কর !



            


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একান্ত ব্যক্তিগত চিঠি || শফিক নহোর

 প্রিয় মেঘবালিকা, বৃষ্টিভেজা এই অলস দুপুরে জানালার পাশে বসে আছি। চারপাশে এক অদ্ভুত সুনসান, কেবল রিমঝিম শব্দে বৃষ্টি যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছে। আর আমি? আমি এই বৃষ্টিস্নাত নির্জনতায় হারিয়ে যাচ্ছি তোমার স্মৃতির ভেতর—ধীরে ধীরে, গভীরভাবে এ এক গভীর প্রেমের নিঃসঙ্গতায় তুমি জুড়ে থাকো আমায়। আজকের এই চিঠি কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়, এটি আমার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। এমন এক হৃদয়, যা আজও শুধুমাত্র তোমার ছায়া খুঁজে বেড়ায় প্রতিটি বাতাসে, প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। জানো, এই বৃষ্টির দিনগুলো কেমন যেন তোমার মতো হয়ে যায়—নরম, গভীর, আর অনির্বচনীয়ভাবে আবেগে পূর্ণ। তোমাকে মনে আছে সেই এক বিকেল? তোমার চোখে সেই অসমাপ্ত গল্পের ভাষা ছিল, যা আমি বুঝতে চেয়েও বোঝার সাহস পাইনি।  তোমার পরনে ছিল নীলরঙা পোষাক, ঠোঁটে ছিল মৃদু হাসি—যা দেখলেই মনে হতো, পুরো দুনিয়া যেন থেমে গেছে কেবল তোমাকে দেখার অপেক্ষায়। তুমি তখন খুব সাধারণভাবে বলছিলে, "আজ আকাশ ভীষণ মনখারাপ করেছে..." আমি চলে যাবো। আমি চুপ রইলাম। ভেতরে ভেতরে বলতে ইচ্ছে করছিল, "না, আকাশ না, মনখারাপ করেছি আমি—কারণ আমি তোমার মনের জানালায় ঢুকতে পারছি...

ছোটগল্প : মৃত বৃক্ষ।। শফিক নহোর

অনেকদিন ধরে বোয়ালমাছ খাবার বায়না ধরেছে মিনু, ও চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা । আজ চলতি মাসের একুশ তারিখ । হাতের অবস্থা বড়ই নাজুক । মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, বেতন হাতে পেলে তুমি যা-যা খেতে চাও? সব এনে দিবো ,চিন্তা করো না। ‘এখন খাবার দাও ?' আমার অফিসে যাবার সময় হলো । ভিলেন মার্কা অভদ্র একজন অফিসার আছে ,সবসময় মানুষের পিছনে একটা পিন বিধিয়ে দেবার পায়তারা চলে অবিরাম ।‘কাকে কি ভাবে পিন দিবে !'আস্তাগফিরুল্লাহ মানুষ কী তাই এত খারাপ হয় । এ অফিসে চাকরি না হলে হয়তো বুঝতাম না ।সকালে বউ রসুনের পাতা দিয়ে টমেটো ভর্তা করেছে ,আহা কি স্বাদ ।গরম ভাতের সঙ্গে হালকা একটু বলরাম কাকার হাতের তৈরিকরা ঘি, ঢেলে নিলাম ।স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে-গেল ।বউ আমার পিছনে দাঁড়িয়ে বলছে, - এই শুনছো, -হ্যাঁ বল, -আমাদের তো একদিনও চিড়িয়াখানা নিয়ে গেলে না । এ সময় চিড়িয়াখানা যেতে নেই । লোকমুখে শুনেছি , ছেলেমেয়ে দেখতে না-কি বানরের মত হয় । ও আল্লাহ্ তুমি এসব কি বলও ।হুম সত্যি বলছি গো বউ ।তা না হলে তোমাকে নিয়ে যাবো না কেন ? তুমি আমার একমাত্র আদরের লক্ষীসোনা বউ । আমার খাওয়া শেষ, বউয়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছে খাঁটের উপর বসলাম । বউ আমা...

প্রিয় মায়াপাখি।। শফিক নহোর

প্রিয় মায়াপাখি কুয়াশায় ঢাকা শহরের তারকাটার অদৃশ্য দেয়াল। কেউ ঢুকতে পারছে না শহরের তারকাটা ভেদ করে। কুয়াশা কোন দেওয়াল মানেনি। সে প্রকৃতির নিয়মে চলে। প্রকৃতিকে রোধ করা যায় না। ভালোবাসা , বিশ্বাস , অনুভূতি হচ্ছে প্রকৃতির অনুচ্ছেদ তাকে কোন নিয়ম দিয়ে আলাদা করতে পারে না। ভৌগোলিকভাবে তুমি দূরে থাকলে বাতাসের সঙ্গে সূর্যের আলোর সঙ্গে তোমার শরীরের ঘ্রাণ ভেসে আসে আমার নাকের ডগায়। তুমি একদিন যোগাযোগ না করলে , দীর্ঘ একাকীত্বের ভেতর ডুবে থাকি তোমার পুরনো স্মৃতিচারণ মনে করে । এই সুখই আমার পরম প্রাপ্তি। তুমি জানতে চাও ! অথচ আমি জানাতে পারি না। এটা আমার অপারগতা ! জানি বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। নিজের কাছেই বিশ্বাস হয় না। নিজের হাত খরচ নেই , আলাদা আড্ডা নেই, বন্ধুদের সঙ্গে পকেট শূন্যতা একধরনের বিষণ্ণ স্বরে কারো কারো চা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে হয়। প্রতিদিন একজনের চা খাওয়া যায় না। ভেতরে ভেতরে লজ্জাবোধ কাজ করে। কারো সঙ্গে দেখা হওয়া জরুরি অথচ দেখা করতে পারছি না। এই কষ্ট ও অপরাধ ব...